
বিশ্ব এখন প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। একসময় বলা হতো, যার কাছে তেল আছে, ভবিষ্যৎ তার। এখন বলা হচ্ছে, যার হাতে সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, ভবিষ্যৎ তার।
আজকের স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, টেলিভিশন, গাড়ি, মেডিকেল যন্ত্র, এটিএম, ব্যাংকের সার্ভার, এমনকি আধুনিক কৃষি যন্ত্রও একটি ছোট্ট চিপ ছাড়া চলতে পারে না। সেই কারণেই বিশ্বের বড় বড় দেশ এখন সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখছে।
এই বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের কাঁচামালের ওপর থেকে সকল ধরনের কর ও শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে আমি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে দেখি। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে আন্তরিক সাধুবাদ জানাই।
অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন—”কর কমানো হলো, এতে আমাদের কী লাভ?”
আসলে লাভটা শুধু একটি শিল্পের নয়; এটি ভবিষ্যতের অর্থনীতি গড়ে তোলার একটি ভিত্তি।
বিশ্ব কোথায়, আমরা কোথায়?
বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এখন শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তির অন্যতম ভিত্তি। World Semiconductor Trade Statistics (WSTS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারের আকার প্রায় ৬২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, এবং ২০২৫ সালে এটি প্রায় ৭০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান McKinsey & Company-এর বিশ্লেষণ বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করতে পারে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই শিল্পে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন ধীরে ধীরে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের দিকে এগোচ্ছে, তখন সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের কাঁচামালের ওপর থেকে কর ও শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে ভবিষ্যৎমুখী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়।
- বর্তমানে বিশ্বের ৭৫%–৯০% উন্নত (advanced) সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন তাইওয়ানে কেন্দ্রীভূত, যা এই শিল্পের কৌশলগত গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
- একটি আধুনিক স্মার্টফোনে প্রায় ১০০টিরও বেশি সেমিকন্ডাক্টর চিপ ব্যবহৃত হয়।
- একটি আধুনিক গাড়িতে ১,০০০ থেকে ৩,০০০টিরও বেশি চিপ থাকতে পারে, আর বৈদ্যুতিক (EV) গাড়িতে এর সংখ্যা আরও বেশি।
- Semiconductor Industry Association (SIA)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় প্রতিটি আধুনিক শিল্প—যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরক্ষা, কৃষি, ব্যাংকিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সেমিকন্ডাক্টরের ওপর নির্ভরশীল।
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় লাভ কোথায়?
আমার মতে, সবচেয়ে বড় লাভ হবে বিনিয়োগে। যখন কোনো শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অতিরিক্ত কর দিতে হয় না, তখন উৎপাদন ব্যয় কমে যায়। ফলে দেশীয় উদ্যোক্তারা যেমন সাহস পান, তেমনি বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করেন। বাংলাদেশে ইতোমধ্যেই মোবাইল ফোন, টেলিভিশন, ফ্রিজ, ল্যাপটপসহ নানা ধরনের ইলেকট্রনিক্স পণ্য তৈরি হচ্ছে। এখন যদি সেমিকন্ডাক্টর-সম্পর্কিত ডিজাইন, টেস্টিং, প্যাকেজিং কিংবা অ্যাসেম্বলি শিল্প গড়ে ওঠে, তাহলে আমাদের প্রযুক্তি খাত এক নতুন ধাপে পৌঁছাতে পারে।
চাকরির বাজারেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স, কম্পিউটার সায়েন্স এবং মাইক্রোইলেকট্রনিক্স বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করছেন। কিন্তু উচ্চপ্রযুক্তির পর্যাপ্ত শিল্প না থাকায় অনেকেই বিদেশমুখী হন। যদি এই শিল্প বিকশিত হয়, তাহলে দক্ষ প্রকৌশলী, গবেষক, টেকনিশিয়ান এবং সফটওয়্যার বিশেষজ্ঞদের জন্য দেশে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। শুধু চাকরিই নয়, গবেষণা ও উদ্ভাবনের নতুন ক্ষেত্রও তৈরি হবে।
তবে শুধু কর কমালেই হবে না
আমি মনে করি, এখানেই সরকারের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তুলতে প্রয়োজন—
- নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ,
- দক্ষ মানবসম্পদ,
- আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার,
- বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্পখাতের সমন্বয়,
- এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত ধারাবাহিকতা।
শুধু কর ছাড় দিলে শিল্প রাতারাতি গড়ে উঠবে না। তবে কর ছাড় একটি শক্তিশালী বার্তা দেয়—বাংলাদেশ এই শিল্পকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
কিছু চ্যালেঞ্জও আছে
যে কোনো কর ছাড়ের মতো এখানেও কিছু ঝুঁকি রয়েছে। স্বল্পমেয়াদে সরকারের কিছু রাজস্ব কমতে পারে। আবার যথাযথ নজরদারি না থাকলে কেউ কেউ এই সুবিধার অপব্যবহারও করতে পারে। তাই কর ছাড়ের পাশাপাশি স্বচ্ছ মনিটরিং, মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ কথা
আমরা যদি সত্যিই ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত, প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে চাই, তাহলে আজ থেকেই উচ্চপ্রযুক্তি শিল্পে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। সেমিকন্ডাক্টরের কাঁচামালের ওপর থেকে কর ও শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে আমি শুধু একটি বাজেট ঘোষণা হিসেবে দেখি না; আমি এটিকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের ভিত্তি তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখি।
এনামুল হক (ভিপি)
সাধারণ সম্পাদক, ধনবাড়ী উপজেলা বিএনপি
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্ত, আমার দৃষ্টিতে, তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তার জন্য নয়; বরং আগামী প্রজন্মের অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থানের ভিত্তি শক্তিশালী করার একটি দীর্ঘমেয়াদি চিন্তার প্রতিফলন।
আজ হয়তো আমরা এই সিদ্ধান্তের পুরো সুফল দেখব না। কিন্তু যদি ধারাবাহিকভাবে সঠিক নীতি, দক্ষ জনশক্তি এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে একদিন বাংলাদেশও বৈশ্বিক প্রযুক্তি সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। আর সেই যাত্রার সূচনালগ্ন হিসেবে এই বাজেটকে ভবিষ্যতে অনেকেই স্মরণ করতে পারেন।
তথ্যসূত্র (References):
- World Semiconductor Trade Statistics (WSTS), Global Semiconductor Market Forecast (2024–2025).
- McKinsey & Company, The Semiconductor Decade: A Trillion-Dollar Industry (2022).
- Semiconductor Industry Association (SIA), 2025 State of the U.S. Semiconductor Industry.
- Deloitte Insights, 2025 Semiconductor Industry Outlook.
- International Energy Agency (IEA), Global Supply Chains of EV Batteries and Semiconductors.
- Taiwan Semiconductor Manufacturing Company (TSMC) – Annual Report (উন্নত চিপ উৎপাদনে তাইওয়ানের অবস্থান সম্পর্কিত তথ্যের জন্য)।
আর্টিকেলটি পাঠিয়েছেন ( হাসিবুল হাসান)
