
বাংলাদেশে বর্ষাকাল মানেই প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে এক অদৃশ্য আতঙ্কও। নদী, খাল, বিল, পুকুর, ডোবা কিংবা বৃষ্টির জমে থাকা পানি—এসবই অনেক শিশুর জন্য প্রাণঘাতী ফাঁদ হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবছর অসংখ্য পরিবার তাদের আদরের সন্তানকে হারায় পানিতে ডুবে। অথচ সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে এই মৃত্যুর বড় একটি অংশই প্রতিরোধযোগ্য।
একটি শিশু হারানোর বেদনা শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি পুরো সমাজের ক্ষতি। তাই এখন সময় এসেছে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুকে “দুর্ঘটনা” নয়, বরং একটি প্রতিরোধযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখার।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক?
বাংলাদেশে ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ পানিতে ডুবে মৃত্যু।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী—
- বাংলাদেশে প্রতিবছর আনুমানিক ১৪,০০০-এর বেশি মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়।
- এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই শিশু।
- অর্থাৎ প্রতি বছর ১০ থেকে ১১ হাজারেরও বেশি শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারায়।
- গড় হিসাবে প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়।
- অধিকাংশ মৃত্যুই ঘটে ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে।
- প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ দুর্ঘটনা বাড়ির ২০ মিটারের মধ্যেই ঘটে।
- বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে, যখন পরিবারের সদস্যরা গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকেন।
এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি স্বপ্ন, একটি পরিবার এবং একটি অপূরণীয় শূন্যতা।
কেন এত শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়?
বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে প্রায় প্রতিটি বাড়ির পাশেই পুকুর, ডোবা বা খাল রয়েছে। ছোট শিশুরা খেলতে খেলতে কখন যে পানির কাছে চলে যায়, অনেক সময় পরিবারের সদস্যরাও তা বুঝতে পারেন না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে—
- শিশুদের একা রেখে কাজ করা,
- নিরাপদ খেলার জায়গার অভাব,
- পুকুর বা জলাশয়ে বেড়া না থাকা,
- সাঁতার না জানা,
- এবং অনেক ক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, কয়েকটি সহজ উদ্যোগ নিলে অধিকাংশ শিশুমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেমন—
- পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুকে কখনো একা না রাখা।
- বাড়ির পাশের পুকুর বা জলাশয়ে নিরাপত্তা বেড়া দেওয়া।
- শিশুদের জন্য নিরাপদ ডে-কেয়ার বা কমিউনিটি শিশু পরিচর্যা কেন্দ্র চালু করা।
- স্কুল পর্যায় থেকেই সাঁতার শেখানো।
- অভিভাবকদের প্রাথমিক জীবনরক্ষাকারী (CPR) প্রশিক্ষণ দেওয়া।
পরিকল্পনা
ধনবাড়ী উপজেলা নদী, খাল ও অসংখ্য পুকুরবেষ্টিত একটি এলাকা। তাই এখানে বর্ষাকালে ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি।
এই বিষয়ে ধনবাড়ী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী জনাব এনামুল হক (ভিপি) বলেন—
“একটি শিশুর মৃত্যু কোনো পরিবারের একার ক্ষতি নয়; এটি পুরো সমাজের ব্যর্থতা। আমরা যদি একটু বেশি সচেতন হই, তাহলে অসংখ্য শিশুর জীবন বাঁচানো সম্ভব। ধনবাড়ী উপজেলায় বর্ষাকালকে সামনে রেখে আমরা ইউনিয়নভিত্তিক সচেতনতামূলক প্রচার, ঝুঁকিপূর্ণ জলাশয়ের তালিকা প্রস্তুত, স্কুলে নিরাপত্তা শিক্ষা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে পরিবারভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে চাই। একটি শিশুর জীবন রক্ষা করাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় সফলতা।”
তিনি আরও বলেন—
“ধনবাড়ীর প্রতিটি ইউনিয়নে যদি জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, স্বেচ্ছাসেবী ও যুবসমাজ একসঙ্গে কাজ করি, তাহলে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।”
আমাদের কী করা উচিত?
এই সমস্যার সমাধান শুধু সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। প্রয়োজন—
- স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ,
- জনপ্রতিনিধিদের সক্রিয় ভূমিকা,
- বিদ্যালয়ে সচেতনতা কর্মসূচি,
- ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রচারণা,
- এবং সর্বোপরি প্রতিটি পরিবারের সতর্কতা।
একটি শিশুকে মাত্র কয়েক মিনিট নজরের বাইরে রাখাই কখনো কখনো একটি পরিবারের সারাজীবনের কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বর্ষা আমাদের জীবনের অংশ। কিন্তু বর্ষা যেন কোনো মায়ের কোল খালি না করে। আজ আমরা যদি সচেতন হই, আগামীকাল হয়তো অসংখ্য শিশু নতুন জীবন পাবে।
একটি শিশু বাঁচানো মানে শুধু একটি জীবন বাঁচানো নয়; একটি পরিবার, একটি ভবিষ্যৎ এবং একটি জাতির সম্ভাবনাকে রক্ষা করা।
তথ্যসূত্র (References)
- World Health Organization (WHO) – Global Report on Drowning: Preventing a Leading Killer (2024 Update).
- UNICEF Bangladesh – Child Injury and Drowning Prevention Programme.
- Centre for Injury Prevention and Research, Bangladesh (CIPRB) – National Injury Survey and Drowning Prevention Studies.
- The Alliance for Safe Children (TASC) – Drowning Prevention in Bangladesh.
- World Health Organization – Bangladesh Country Office – Drowning Prevention Factsheets.