২০১১ সালের ভূমিকম্পে পূর্ব দিকে সরে যায় গোটা জাপান

২০১১ সালের ভয়াবহ ‘তোহুকু’ ভূমিকম্পের ঠিক ১৫ মিনিট পর একটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক টেকটোনিক বা ভূত্বকীয় আলোড়ন ঘটেছিল। এর ফলে প্রায় সমগ্র জাপান পূর্ব দিকে পাঁচ মিলিমিটার (আধা সেন্টিমিটার) সরে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, ৯ মাত্রার সেই ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূকম্পন তরঙ্গ ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার ৮০০ কিলোমিটার গভীরে পৃথিবীর কেন্দ্রে আঘাত করে এবং সেখান থেকে প্রতিফলিত হয়ে আবারও পৃষ্ঠে ফিরে আসে। এই প্রত্যাগত তরঙ্গের ধাক্কায়ই গোটা দেশ আচমকা পূর্ব দিকে ছিটকে যায়।

এ বিষয়ে ‘নিও সায়েন্টিস্ট’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পটির দৃশ্যমান ধ্বংসলীলা ছিল স্থানীয়ভাবে কয়েক মিটার ভূমির স্থানচ্যুতি কিংবা ফুকুশিমা পারমাণবিক কেন্দ্রের তিনটি চুল্লি গলিয়ে দেওয়া ৪০ মিটার উঁচু সুনামির মতো ঘটনাগুলো। সেই তুলনায় জাপানের পাঁচ মিলিমিটার আন্দোলনকে হয়তো সামান্য মনে হতে পারে। কিন্তু এই সামান্য স্থানচ্যুতি ঘটেছে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে—যা ভূমিকম্পের মূল ফাটল রেখার চেয়ে প্রায় সাত গুণ বড় এবং ইতিহাসে রেকর্ড করা যেকোনো ভূত্বকীয় বিচ্যুতির চেয়ে দীর্ঘ।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সুনইয়ং পার্ক বলেন, ‘আমরা প্রায় পুরো জাপানে একই সময়ে ও একই মাত্রায় এই পাঁচ মিলিমিটারের পূর্বমুখী স্থানান্তর লক্ষ করেছি। অথচ ঠিক ওই মুহূর্তে কাছাকাছি কোনো সাধারণ ভূমিকম্প ছিল না।’

এই স্থানচ্যুতির পরিধি কেবল উত্তর-দক্ষিণেই বিস্তৃত ছিল না, বরং তা পুরো জাপানের প্রস্থ অতিক্রম করে সাগরের তলদেশ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। জাপানের জিপিএস স্টেশনগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে পার্কের দল ও তিনি নিশ্চিত হয়েছেন, এই গতিবিধি পুরো জাপানের মূল ভূখণ্ডজুড়েই দৃশ্যমান ছিল।

সাধারণত ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট তরঙ্গ পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে কেন্দ্র থেকে প্রতিফলিত হয়ে যখন ফিরে আসে, ততক্ষণে তা বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু তোহুকু ভূমিকম্পের মূল ধাক্কা এতটাই তীব্র ছিল যে, ফিরে আসা তরঙ্গটি দুর্বল হওয়ার পরও সমগ্র জাপানকে একযোগে কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। এর ফলে জাপানের নিচে থাকা চারটি সংযুক্ত টেকটোনিক প্লেট একসঙ্গে নড়ে ওঠে। গবেষকদের ধারণা, মূল ভূমিকম্পের তীব্র কম্পন আগেই প্লেটগুলোর সীমানাকে দুর্বল করে দিয়েছিল, যার ফলে কেন্দ্র থেকে ফিরে আসা তরঙ্গটি সহজেই এই বিস্তর এলাকাকে স্থানচ্যুত করতে পেরেছে।

এই ঘটনা বিজ্ঞানীদের সামনে ভূমিকম্প-পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞের এক নতুন ও অজানা দিক উন্মোচন করেছে। গবেষক পার্কের মতে, বড় কোনো ভূমিকম্পের পর পৃথিবীর গভীর থেকে ফিরে আসা এই ধরনের তরঙ্গের কারণে দূরবর্তী অঞ্চলেও নতুন করে ভূমিকম্পের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা নিয়ে এখন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

নিউজিল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ক্যান্টারবেরির গবেষক রবিন লির মতে, এই ঘটনা প্রমাণ করে—বড় ভূমিকম্পগুলো আশাতীত বিশাল অঞ্চলজুড়ে ও কয়েক মিনিট পর বিলম্বিত ভূত্বকীয় আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের সমগোত্রীয় ফল্ট বা ফাটল রেখাগুলোতে এর প্রভাব কেমন হতে পারে, তা নিয়ে এখন আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top